গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী: সুপ্রিম কোর্টে মমতার সওয়াল ও ভোটার তালিকার ভবিষ্যৎ

সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতে সওয়াল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সুপ্রিম কোর্টের লাইভ স্ট্রিমিংয়ের ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি।

নিজস্ব প্রতিবেদন: বিরলের মধ্যে বিরলতম। নজিরবিহীন। ঐতিহাসিক। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার। এসআইআর (Special Intensive Revision) মামলায় সুপ্রিম কোর্টে (Supreme Court) মমতা (Mamata Banerjee) বন্দ্যোপাধ্যায়ের সওয়াল করার ঘটনাকে এভাবেই ব্যাখ্যা করছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু এই ঘটনা এবং তার প্রভাব কি শুধু এই কয়েকটি কথায় ব্যাখ্যা করা যায়? এর প্রভাব সুদুরপ্রসারী। সশরীরে উপস্থিত হয়ে মুখ্যমন্ত্রীর এই সওয়াল একাধারে রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান এবং পেশাদার আইনজীবী হিসেবে তাঁর এই পদক্ষেপে ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় রাজনীতির এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।

দিল্লির তিলক মার্গে সুপ্রিম কোর্টের এক নম্বর আদালত কক্ষে বুধবার যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের সওয়াল শুরু করলেন, তখন তা কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া ছিল না, ছিল রাজ্যের প্রশাসনিক অস্তিত্ব রক্ষার এক রাজনৈতিক লড়াই। মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গের জন্য যে SIR প্রক্রিয়া গ্রহণ করেছে, তা আসলে ভোটার অন্তর্ভুক্তি নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে 'ভোটার ছাঁটাই'-এর একটি প্রক্রিয়া।

বাংলাকেই টার্গেট

মুখ্যমন্ত্রী সুপ্রিম কোর্টে উপস্থিত হয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, "কেন কেবল পশ্চিমবঙ্গকেই এভাবে টার্গেট করা হচ্ছে? অসম বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিতে কেন একই পদ্ধতিতে কাজ হচ্ছে না?" প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, 'লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি' বা যুক্তিহীন অসঙ্গতির দোহাই দিয়ে প্রায় ১ কোটি ৩৬ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকায় প্রশ্নের মুখে ফেলে দেওয়া হয়েছে। সামান্য বানান ভুল (যেমন—'Datta' বনাম 'Dutta') বা নামের ইংরেজি অনুবাদের ত্রুটিকে 'বিরাট ভুল' হিসেবে দেখিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে নোটিস পাঠানো হচ্ছে।

মাইক্রো-অবজার্ভার তত্ত্ব

মমতার অভিযোগ, কমিশন রাজ্য সরকারের নিযুক্ত বিএলও (BLO)-দের ওপর আস্থা না রেখে ভিন রাজ্যের মাইক্রো-অবজার্ভারদের নিয়োগ করেছে। তাঁর দাবি, এই মাইক্রো-অবজার্ভাররা সরাসরি ভোটারদের নাম কাটছেন, যা বেআইনি। DEO, ERO-দের ক্ষমতা খর্ব করে কে ভোটার তালিকায় থাকবে বা না থাকবে, সেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বিজেপিশাসিত রাজ্য থেকে আসা এই মাইক্রো অবজার্ভাররা। 

নথির কড়াকড়ি

সুপ্রিম কোর্ট আধার কার্ডকে বৈধ পরিচয়পত্র হিসেবে মান্যতা দিলেও নির্বাচন কমিশন তা মানছে না বলে অভিযোগ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বারবার চিঠি দিলেও কমিশন কোনও উত্তর দিচ্ছে না বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন মমতা।

মানবিক সঙ্কট

মুখ্যমন্ত্রী আদালতকে জানান, ভোটার তালিকার এই সংশোধনী প্রক্রিয়ার চাপে রাজ্যে ইতিমধ্যেই কয়েকজন বিএলও আত্মহত্যা করেছেন এবং বহু মানুষ আতঙ্কিত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

বিচারপতির পর্যবেক্ষণ

মুখ্যমন্ত্রীর সওয়াল শোনার পর প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, "প্রতিটি প্রকৃত ভোটারের নাম তালিকায় থাকা উচিত। একজনও বৈধ নাগরিক যেন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত না হন।" বিচারপতিরা বানান ভুলের প্রসঙ্গে জানান যে, ২০০২ সালের বাংলা তালিকার অনুবাদের সময় ত্রুটি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে তাঁরা এই নির্দেশও দেন যে, মৃত বা অযোগ্য ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া আইনসম্মত এবং সেই প্রক্রিয়া চলবে।

নির্বাচন কমিশনের সওয়াল

কমিশনের পক্ষে বর্ষীয়ান আইনজীবী রাকেশ দ্বিবেদি অভিযোগ করেন যে, রাজ্য সরকার এই বিশাল কর্মযজ্ঞে প্রয়োজনীয় কর্মী সরবরাহ করছে না। কমিশনের দাবি, রাজ্য সরকার মাত্র ৮০ জন এসডিএম (SDM) পদমর্যাদার অফিসার দিয়েছে। বিএলও পদে রাজ্য পর্যাপ্ত সরকারি কর্মচারী না দিয়ে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের পাঠাচ্ছে, যাদের তদন্ত করার আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তথ্য যাচাইয়ের জন্য কমিশন যে প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, তা ত্রুটিমুক্ত করার চেষ্টা চলছে।

সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তী নির্দেশ

সব পক্ষের সওয়াল শেষে সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে নোটিস জারি করেছে। আদালত নির্দেশ দিয়েছে, আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি কমিশনকে বিস্তারিত হলফনামা দিয়ে তাদের অবস্থান জানাতে হবে। বহু মানুষের নাম সংশোধনের অপেক্ষায় থাকায় শুনানির সময়সীমা বাড়ানোর ইঙ্গিতও দিয়েছে আদালত। ৯ ফেব্রুয়ারি মামলার পরবর্তী শুনানি।

তুঙ্গে চাপানউতোর

মমতার এই নজিরবিহীন পদক্ষেপকে ঘিরে উত্তাল বঙ্গ রাজনীতি। ভোটের আগে এ নিয়ে শাসক-বিরোধী তরজার পারদ তুঙ্গে উঠেছে। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এই পদক্ষেপকে 'গণতন্ত্রের জয়' বলে বর্ণনা করেছেন। তৃণমূলের দাবি, বিজেপি হার নিশ্চিত জেনে কমিশনের মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে তৃণমূল সমর্থকদের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা করছে, যা মুখ্যমন্ত্রী ধরে ফেলেছেন।

রাজ্য বিজেপির সভাপতি সুকান্ত মজুমদার বিরোধী দলনেতা কার্যত এক সুরেই বলেছেন, রাজ্যে কোটি কোটি অনুপ্রবেশকারী ভোটার রয়েছে। ভোটার তালিকা স্বচ্ছ করা কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং মুখ্যমন্ত্রী এই প্রক্রিয়ায় বাধা দিয়ে আসলে অনুপ্রবেশকারীদের আড়াল করতে চাইছেন।

বাম নেতা মহম্মদ সেলিমের মতে, তৃণমূল ও বিজেপি দুজনেই ভোটার তালিকা নিয়ে মেরুকরণের রাজনীতি করছে। তবে তাঁরা একমত যে, কোনো বৈধ ভোটারের নাম যেন প্রশাসনিক জটিলতায় বাদ না পড়ে। কংগ্রেসের তরফেও জানানো হয়েছে, স্বচ্ছ ভোটার তালিকা কাম্য, কিন্তু সাধারণ মানুষের হয়রানি মেনে নেওয়া যায় না।

সুপ্রিম কোর্টে এমন শয়ে শয়ে মামলার শুনানি হয় প্রতিদিন। প্রশ্ন হল, এর প্রভাব কতটা? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী কী সুবিধা পেতে পারেন এবং পশ্চিমবঙ্গ তথা দেশের রাজনীতিতে ভবিষ্যতে এর কী প্রভাব পড়তে পারে? সেই বিষয়ে একবার আলোচনা করা যাক। 

বিচারব্যবস্থায় নয়া ইতিহাস

সাধারণত প্রশাসনিক প্রধানরা আইনি লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে দেন পেশাদার আইনজীবীদের হাতে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই প্রথা ভেঙে যখন সুপ্রিম কোর্টে রাজ্যের স্বার্থে নিজে সওয়াল করেন বা উপস্থিত থেকে আইনি লড়াইয়ের দিশা নির্ধারণ করেন, তখন তা কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া থাকে না—তা হয়ে ওঠে গভীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বার্তা। SIR সংক্রান্ত মামলায় রাজ্য বনাম কেন্দ্রের এই সংঘাত বর্তমানে ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর এক অগ্নিপরীক্ষা। ভবিষ্যতে বিচারব্যবস্থায় এক নজির তৈরি করলেন, যা ভবিষ্যতে রাজনীতি থেকে বিচারব্যবস্থায় বারবার উঠে আসবে। 

বাঙালি অস্মিতা ও রাজ্যের অধিকার রক্ষার লড়াই

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, "কেন কেবল পশ্চিমবঙ্গকেই লক্ষ্য করা হচ্ছে?" এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ফের ‘বাংলার প্রতি বঞ্চনা’ এবং ‘কেন্দ্রীয় আধিপত্যবাদ’-এর তত্ত্বকে উসকে দিয়েছেন। এটি আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হতে পারে। নিজের রাজ্যের মানুষের ভোটাধিকার রক্ষায় সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করে তিনি নিজেকে ‘বাংলার অতন্দ্র প্রহরী’ হিসেবে তুলে ধরেছেন, যা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারে।

প্রতিষ্ঠান বনাম প্রশাসনিক প্রধান

নির্বাচন কমিশনকে ‘WhatsApp Commission’ বলে আক্রমণ করা বা কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সরাসরি শীর্ষ আদালতে প্রশ্ন তোলা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর ফলে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে রাজ্য সরকারের সংঘাত এক চরম পর্যায়ে পৌঁছাল। অতীতে কেন্দ্রীয় এজেন্সির (CBI, ED) বিরুদ্ধে রাজপথে ধর্ণায় বসেছিলেন মমতা, এবার সরাসরি আইনি লড়াইয়ের ময়দানে নেমে তিনি বার্তা দিলেন যে, প্রশাসনিক স্তরে অসহযোগিতার অভিযোগ থাকলেও তিনি বিচারবিভাগের ওপর আস্থা রেখেই লড়বেন।

সর্বভারতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্বের দাবিদার?

দেশের ইতিহাসে কোনও ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রীর নিজে সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করা বিরল। এই ঘটনার ফলে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন এবং পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনের আগে জাতীয় রাজনীতিতে অ-বিজেপি জোটের (INDIA জোট) অন্যতম কান্ডারী হিসেবে মমতার গুরুত্ব আরও বাড়ল। বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে (যেমন অসম) কেন একই পদ্ধতি নেওয়া হচ্ছে না—এই প্রশ্ন তুলে তিনি বিরোধী ঐক্যের সুর বেঁধে দিয়েছেন।

বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের পাল্টা চাপ

বিরোধী দল বিজেপি এই ঘটনাকে ‘অনুপ্রবেশকারীদের বাঁচানোর চেষ্টা’ হিসেবে বর্ণনা করছে। এর ফলে বঙ্গ রাজনীতিতে মেরুকরণের রাজনীতি আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিজেপি সাধারণ মানুষের কাছে এই বার্তা দিতে চাইবে যে, ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণে বাধা দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আসলে ‘ভোটব্যাঙ্ক’ রক্ষা করছেন। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনও আইনিভাবে প্রমাণ করতে চাইবে যে তাদের এই SIR প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তি নির্ভর।

আমলাতন্ত্র ও পুলিশের ওপর প্রভাব

মুখ্যমন্ত্রী নিজে যখন কোনও প্রশাসনিক কাজের ত্রুটি নিয়ে আদালতে সওয়াল করেন, তখন তার প্রভাব রাজ্যের আমলাতন্ত্র ও পুলিশের ওপর পড়ে। ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় যুক্ত বুথ লেভেল অফিসার (BLO) বা মহকুমা শাসকদের ওপর যেমন একদিকে কাজের চাপ ও নজরদারি বাড়বে, তেমনই মুখ্যমন্ত্রীর পাশে দাঁড়ানো তাদের মনোবল বাড়াবে বলেই আমলা মহলের বড় অংশের মত। 

এই মামলার গতিপ্রকৃতি কেবল পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, বরং ভারতের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কমিশনের এক্তিয়ার ও রাজ্যের স্বাধিকারের সীমা কতটুকু, তা-ও পরিষ্কার করবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ‘সুপ্রিম-অ্যাকশন’ প্রমাণ করল যে, আগামী দিনে নির্বাচনী লড়াই কেবল বুথস্তরে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা সংবিধান এবং আদালতের অলিন্দেও সমান্তরালভাবে চলবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুপ্রিম-সওয়াল আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে এক নতুন মাত্রা যোগ করল। ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো একটি প্রশাসনিক বিষয় এখন সাংবিধানিক লড়াইয়ের রূপ নিয়েছে। ৯ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী শুনানির দিকে তাকিয়ে এখন গোটা বাংলা। বিচারবিভাগ কি পারবে আমজনতার ভোটাধিকার সুরক্ষিত রেখে একটি নির্ভুল ভোটার তালিকা নিশ্চিত করতে? উত্তর মিলবে শীর্ষ আদালতের পরবর্তী রায়ে।