চব্বিশে মেগা জলসা, মঞ্চ তৈরির তোড়জোড় ২৩ জুড়ে

নতুন বছরে শুরু হয়ে গেল ২০২৪-এর লোকসভার (Lok Sabha Election 2024) ঘুঁটি সাজানো। অলঙ্করণ: সুবর্ণরেখা টিম

আর এস মুখোটি

আরও একটা নতুন বছর শুরু হয়ে গেল। পরের বছরই লোকসভা ভোট (Lok Sabha Election 2024)। নতুন করে আবার কিছু টার্গেট। লক্ষ্য পূরণের জন্য নতুন কিছু ছক, নতুন কিছু চাল, নতুন কিছু ট্রাম্প কার্ড। কর্পোরেট ভারতের বোর্ডরুমে এখন তারই চূড়ান্ত ব্যাস্ততা। ব্যাস্ত আমাদের রাজনীতির পারফর্মাররাও। এক এক জনের টার্গেট এক এক রকম। তবে মূল লক্ষ্য চব্বিশের লোকসভার মেগা জলসার মঞ্চে জায়গা করে নেওয়া। কারও লক্ষ্য লিড সিঙ্গার হওয়া, তো কেউ চাইছেন কনসার্ট মাস্টার হয়ে পুরো অর্কেস্ট্রাটাকে চালনা করতে। কেউ খঞ্জনি হাতে পেলেই খুশি, তো কেউ পণ করে ফেলেছেন অ্যানাউন্সার তিনিই হবেন। বড় বড় টার্গেট তো থাকতেই পারে, কিন্তু ওই মেগা জলসার মঞ্চে ওঠার হকদার কে হবে, তা ঠিক করবে তেইশের পারফরম্যান্স। 

সারকথা হল, চলতি বছরে নয় রাজ্যের ভোট (Assemble Elections)। এই ভোটে যাদের ফল ভাল, চব্বিশের লোকসভা ভোটে অ্যাডভান্টেজ তাদের। মানে জলসার মেগা মঞ্চে তাঁরাই বাজাবেন, তাঁরাই গাইবেন, তাঁরাই সঞ্চালনা করবেন। হেরোরা দর্শকাসনে। কে কোথায় তা ঠিক করে দেবে রাজাস্থান, ত্রিপুরা, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিসগড়, তেলঙ্গানার মতো নয় রাজ্যের বিধানসভা ভোটের ফল। ভোটমুখী এই সব রাজ্যে কার গলায় কাঁটা আটকেছে, কে ম্যারাথনের লাস্ট ল্যাপে, কোথায় মীরজাফরদের দাপট বেশি, এবার সেদিকে একটু নজর দেওয়া যাক। 

ত্রিপুরা 

আঠেরোতে ত্রিপুরা জিতে সবাইকে চমকে দিয়েছিল বিজেপি। বাম ত্রিপুরাতে মুখ্যমন্ত্রী গেরুয়া বিপ্লব। বেফাঁস বলে মাঝে মাঝেই শিরনামে। জিম ইন্সট্রাকটরের রাজনীতির ধরনে ক্ষুব্ধ দলেরই অনেকে। প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা আটকাতে বিপ্লব বদলে মানিকেই আস্থা বিজেপির। তবে এ মানিক সরকার নয়, সাহা। নেতা পাল্টেও অবশ্য দলে ঝগড়া বন্ধে ডাহা ফেল গেরুয়া শিবির। এবার তাই ভরসা সেই চেনা শাহি টোটকা। মানে পালে হাওয়া টানতে রথ ছোটাবেন অমিত শাহ। রাজ্যে শাসকের অন্যতম বন্ধু আদিবাসীদের সংগঠন IPFT-র সঙ্গে সম্পর্কে চরা পড়েছে। বিজেপি ছেড়ে নতুন ফ্রন্ট বানাচ্ছেন আদিবাসী নেতা হংস কুমার ত্রিপুরা। লাল পার্টি তার হারানো জমি অনেকটা ফিরে পেয়েছে। বাম-কং-আদিবাসী ত্রিফলা, আর তার সঙ্গে দলীয় কোন্দলে ত্রিপুরাতে অস্বস্তিতে গেরুয়া শিবির। 

আরও পডু়ন: 'বেলাইন' বন্দে ভারত, ফের মমতার সামনে জয় শ্রীরাম! মুখ পুড়ল কার?

রাজস্থান

মরুরাজ্যে কংগ্রেসের অবস্থা ত্রিপুরার বিজাপির মতো। গেহলট বনাম পাইলট ঝগড়া সামলাতে হিমশিম রাহুল গান্ধীও। তার উপর প্রতিদিন বাড়ছে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার ঝাঁজ। এদিকে গেরুয়া শিবিরে আবার অনেকটাই গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছেন বসুন্ধরা রাজে। পাক লাগোয়া রাজ্যের ভোটে জাতীয়তাবাদ বরাবরই মোদী-শাহের আস্তিনের সেরা তাস। গুজরাত নির্বাচনের সাফল্যের রেশ পাশের রাজ্যেও বিজেপিকে অনেকটা এগিয়ে রাখবে। 

কর্নাটক 

হিন্দুত্বের রাজনীতির নতুন ল্যাব-এর ঠিকানা এখন কর্নাটক। দক্ষিণে পদ্মের একমাত্র উর্বর জমি। উন্নয়নের রাজনীতি এখানে পিছনের সিটে। মেরুকরণের নতুন নতুন ফর্মুলার জন্ম দিচ্ছে এ রাজ্যের শাসক শিবির। পালা করে দুর্নীতিতে নাম জড়াছে বিজেপির তাবড় নেতাদের। তারই মধ্যে বোম্মাই বনাম ইয়েদুরাপ্পা তু-তু ম্যায়-ম্যায় শাসকের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। রাহুলের ভারত জোড়ো যাত্রা কংগ্রেসকে অনেকটাই চাঙ্গা করেছে তাদের এক সময়ের এই শক্ত ঘাঁটিতে। 

আরও পডু়ন: ‘ঠগ’ প্রধান বাছতে পঞ্চায়েত উজাড় হবে না তো? অভিষেকের ইস্তফার নির্দেশে ক্ষোভ দলেই!

মধ্যপ্রদেশ 

জুলাই মাসে স্থানীয় নির্বাচনে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে বিজেপি। কংগ্রেস অনেক তেড়েফুরে নামলেও শাসকের সঙ্গে পেরে ওঠেনি। তা স্বত্তেও গো-বলয় এর এই রাজ্যে কোনওরকম ঝুঁকি নিতে চাইছে না গেরুয়া শিবির। মুখ বদলে এখানে নতুন করে ঝাঁপানোর পরিকল্পনা শাসক শিবিরের। হার্টল্যান্ড পলিটিক্সের সব দাঁও-প্যাঁচ এখানে কাজে লাগাতে ঝাঁপাছে দু’দলই। এখানে ধাক্কা মানে গোটা গো-বলয়ে তার প্রভাব। সুতরাং সব শক্তি দিয়ে ঝাঁপাবে গেরুয়া শিবির। 

ছত্তিসগড় 

নির্দ্বিধায় হাত শিবিরের সব থেকে শক্ত ঘাঁটি। ২০১৮-র ভোটে ৯০-এর মধ্যে আটষট্টি আসনে জিতেছিল কংগ্রেস। হাজার চেষ্টা করেও এখানে হারানো জমি ফিরে পাচ্ছে না পদ্মপার্টি। শেষ পাঁচটি উপনির্বাচনের রেজাল্ট সে কথাই বলছে।  তিন-তিনটে নতুন জেলা তৈরি করেছে বাঘেল সরকার। এই জেলাগুলোর উন্নতির লক্ষ্য়ে প্রায় হাজার কোটির তহবিল ঘোষণা করেছে সরকার। এই মুহূর্তে অনেকটাই অ্যাডভাণ্টেজ হাত শিবির। 

তেলঙ্গানা 

তেলঙ্গানা মানে TRS। মানে চন্দ্রশেখর রাও। বিজেপি-বিরোধী আঞ্চলিক দলগুলো যদি আর্জেন্টিনা হয়, চন্দ্রশেখর রাও তবে নিঃসন্দেহে সেই টিমের ডি মারিয়া। গত পাঁচ বছর ধরে তেলেঙ্গানায় খাপ খুলতে পারছে না বিজেপি। কিন্তু তা সত্তেও মাটি কামড়ে পড়ে আছে গেরুয়া শিবির। মুনুগরু উপনির্বাচনে ভোটের ফল বলছে, তেইশে আর হাল্কা করে নেওয়া যাবে না পদ্ম পার্টিকে। কংগ্রেসের ভোট কমতে কমতে তলানিতে ঠেকেছে। সেই ভোট এবার গেরুয়া শিবিরে ঢুকতে শুরু করেছে। চন্দ্রশেখর রাও এর পরিবারভিত্তিক রাজনীতিকে বিজেপি খুব সাফল্যে সঙ্গে ফ্রন্ট সিটে নিয়ে ছলে এসেছে। তেইশে কি চন্দ্রশেখর রাও তেলঙ্গানার মমতা হয়ে উঠতে পারবেন, নাকি এমবাপের মতো ছলছল চোখে ভিক্ট্রি স্ট্যান্ডের ২ লেখা ধাপটাতে দাঁড়াবেন, তার উপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। 

মেঘালয়/নাগাল্যান্ড/মিজোরাম 

উত্তর-পূর্ব ভারতের এই তিন রাজ্যে ইতিমধ্যেই ভিত শক্ত করেছে বিজেপি। কংগ্রেসের প্রভাব প্রতিপত্তির গ্রাফ অনেকটাই নীচে নেমে এসেছে। আঞ্চলিক দলগুলোর কেউ চলছে নিজের মর্জিতে, কেউ আবার বিজেপির বন্ধু। নতুন করে এই অঞ্চলে পা রেখেছে তৃণমূল। এক দল থেকে জিতে অন্য দলে যোগ দেওয়া এখানে জলভাত হয়ে গিয়েছে। আম ভোটাররা তা নিয়ে ছ্যা-ছ্যা করছেন না। তিন রাজ্যেই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে হাত শিবির। আঞ্চলিক দলগুলো ভোট এগনোর সঙ্গে সঙ্গে চাপ বাড়াচ্ছে বিজেপির উপর। একটা সামগ্রিক অস্থিরতা আছে। তৃণমূল তার থেকে ডিভিডেন্ড তুলতে আসরে নেমে পড়ে খেলা আরও জমিয়ে দিয়েছে। 

জম্মু-কাশ্মীর 

৩৭০ ধারা তুলে নেওয়ার পর প্রথম ভোট হবে ভূস্বর্গে। ২০১৮ থেকে রাষ্ট্রপতি শাসন চলছে এখানে। তার পর উপত্যকা দিয়ে কত জল বয়ে গেল তার হিসেব নেই। জম্মুতে প্রচুর শক্তি বাড়িয়েছে বিজেপি। তবে কাশ্মীর অঞ্চলে এখনও আবদুল্লা আর মুফতিদের দাপট। এলাকা পুনর্বিন্যাস, ৩৭০ প্রত্যাহার, স্বশাসন - এই সব ইস্যূতে ভোট হবে। এই নির্বাচনে জেতাটা বিজেপির রাজনৈতিক আদর্শকে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এর পাশাপাশি তেইশ প্রমান করবে ব্র্যান্ড রাহুল কতটা বেগ দেবে বাকিদের, দিল্লির রাজনীতিতে মমতা কতটা মোদী-বিরোধী শিবিরের মুখ হয়ে উঠতে পারবেন। এই নয় রাজ্যের ভোটের ফলাফলের অঙ্ক ঠিক করবে চব্বিশে ভারতীয় রাজনীতির মেসি, ডি মরিয়া বা মার্টিনেজ কারা হয়ে উঠবেন।


লেখক প্রাক্তন সাংবাদিক ও বর্তমানে একটি  কর্পোরেট সংস্থার মিডিয়া অ্যাডভাইজার পদে কর্মরত।